একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে ১৫টি করনীয় কাজ
সকালে কম্পিউটার খুলে কাজ শুরু, তারপর একের পর এক ই-মেইল, রিপোর্ট, ডিজাইন, কোডিং, অনলাইন মিটিং কখন যে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়, অনেক সময় টেরই পাওয়া যায় না। কাজ শেষ করে চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় চোখে যেন বালি ঢুকে আছে, পানি পড়ছে, ঝাপসা দেখছি বা কপালের কাছে চাপ ধরেছে। এই অভিজ্ঞতা এখন অফিসকর্মী, শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার ও অনলাইন পেশাজীবীদের কাছে খুব পরিচিত। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে চোখের পলক কমে যেতে পারে, ফলে চোখের সামনের অশ্রুস্তর দ্রুত শুকিয়ে অস্বস্তি তৈরি ও জ্বালা অনুভব হয়। ডিজিটাল আই স্ট্রেইনের সঙ্গে শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া, চোখ ক্লান্ত লাগা, ঝাপসা দেখা ও মাথাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কম্পিউটার ব্যবহার মানেই চোখ নষ্ট হয়ে যাবে এমন কথা ঠিক নয়। বরং কাজের ধরন, বিরতি, আলো, স্ক্রিনের অবস্থান, চোখের পলক ফেলার অভ্যাস এবং প্রয়োজন হলে সঠিক চশমা ব্যবহার, এই ছোট ছোট বিষয়গুলো ঠিক করলেই অনেক অস্বস্তি কমানো সম্ভব। তাই একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে ১৫টি করনীয় কাজ না করে শুধু কোনো একটি চশমা কেনার দিকে না তাকিয়ে আপনার দৈনন্দিন অভ্যাসটাকে একটু গোছানো দরকার।
একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে ১৫টি করনীয় কাজ বুঝতে হলে আগে জানতে হবে কোন অভ্যাসগুলো আপনার চোখকে সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত করছে।
পোষ্ট সূচিপত্রঃ একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে ১৫টি করনীয় কাজ।
- কেন কম্পিউটারে কাজ করলে চোখে অস্বস্তি হয়?
- কম্পিউটার ব্যবহারে চোখের কোন লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে?
- একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে ১৫টি করনীয় কাজ
- সহজে মনে রাখার মতো ১০টি অভ্যাস
- শেষ কথাঃ একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে ১৫টি করনীয় কাজ
কেন কম্পিউটারে কাজ করলে চোখে অস্বস্তি হয়?
ল্যাপটপ অথবা ডেক্সটপ কম্পিউটারের স্ক্রিনে কাজ করার সময় আমরা সাধারণত কাছের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ রাখি। এতে চোখকে একই দূরত্বে বারবার ফোকাস করতে হয়। তার ওপর মনোযোগ দিয়ে পড়া বা টাইপ করার সময় স্বাভাবিকের তুলনায় চোখের পলক কম পড়তে পারে। চোখের পলক কম পড়লে চোখের পৃষ্ঠে অশ্রুর স্তর সমানভাবে ছড়িয়ে পড়তে বাধা পায় এবং চোখের শুষ্কতা বাড়তে পারে। স্ক্রিনের ঝলক, ভুল উজ্জ্বলতা, খুব ছোট লেখা, জানালা বা আলোর প্রতিফলন এবং ভুল ভাবে বসার ভঙ্গিও চোখের অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
এই কারণে একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা হলে আপনার প্রথম কাজ হওয়া উচিত সমস্যাটিকে শুধু “চোখ দুর্বল হয়ে গেছে” বলে ধরে না নিয়ে দৈনন্দিন কাজের পরিবেশটি খেয়াল করা। আপনি কি খুব কাছে বসে কাজ করছেন? স্ক্রিনে কি জানালার আলো পড়ছে? ফন্ট কি খুব ছোট? ঘর কি অতিরিক্ত অন্ধকার? আপনি কি দীর্ঘ সময় বিরতি ছাড়া কাজ করছেন? এমন প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় সমস্যার কারণ বুঝতে সাহায্য করে।
কম্পিউটার ব্যবহারে চোখের কোন লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে?
আপনার চোখে ক্লান্তি, জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা, লালচে ভাব, পানি পড়া, সাময়িক ঝাপসা দেখা, ফোকাস বদলাতে অস্বস্তি এবং চোখের চারপাশে ভারী লাগা এসব সাধারণ উপসর্গের মধ্যে পড়ে। কারও কারও মাথাব্যথা, ঘাড় ও কাঁধে ব্যথাও হতে পারে। আপনি যদি লক্ষ্য করেন যে কাজের মাঝখানে বারবার চোখ কচলাতে হচ্ছে, লেখা পড়তে চোখ ছোট করতে হচ্ছে, বা স্ক্রিন থেকে চোখ সরানোর পর কিছুক্ষণ ঝাপসা লাগছে, তাহলে আপনার কাজের রুটিনে পরিবর্তন আনা দরকার। একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা হলে, এই উপসর্গকে অবহেলা না করে প্রথমেই বিরতি, পলক ফেলা এবং স্ক্রিনের সেটিং ঠিক করার অভ্যাস করুন।
একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে ১৫টি করনীয় কাজ।
১। ২০-২০-২০ রুলস মেনে চলা।
চোখের যত্নে সবচেয়ে সহজ অভ্যাসগুলোর একটি হলো ২০-২০-২০ নিয়ম। প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তু দেখুন। এই বিরতি চোখের একটানা কাছের কাজে ফোকাস ধরে রাখার চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে করনীয় হিসেবে নিয়মিত বিরতিকে আপনার কাজের অংশ বানানো সবচেয়ে সহজ শুরু হতে পারে। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এই নিয়ম বিশেষভাবে ব্যবহারিক। আপনি যদি আর্টিকেল রাইটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, প্রোগ্রামিং বা অনলাইন ক্লায়েন্টের কাজ করেন, তাহলে কাজের সফটওয়্যারে টাইমার বসিয়ে নিতে পারেন।
প্রতি ২০ মিনিটে কাজ করে বিরতি নেয়া সম্ভব না হলে, অন্তত কাজের সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছে বিরতি নিন। আবার বিরতির সময় ফোনে স্ক্রল করলে চোখের বিশ্রাম হবে না, বরং অন্য একটি স্ক্রিনে চলে যাবেন। তাই জানালার বাইরে তাকানো, ঘরের দূরের কোনো বস্তু দেখা বা কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ রাখা বেশি আরামদায়ক। ফ্রিল্যান্সারদের চোখের ব্যায়াম বলতে জোর করে চোখ ঘোরানো বা কোনো কঠিন কৌশল বোঝায় না। চোখকে স্বাভাবিকভাবে দূরে ও কাছে ফোকাস করার সুযোগ দেওয়া, নিয়মিত চোখের পলক ফেলা এবং বিরতি নেওয়াই বেশি বাস্তবসম্মত। মনে রাখবেন, সাধারণ চোখের ব্যায়াম চশমার প্রয়োজন দূর করে এইধারণা ঠিক নয়।
২। ব্লু লাইট প্রোটেক্ট চশমার ব্যাহার।
ব্লু লাইট প্রোটেক্ট চশমা নিয়ে অনলাইনে অনেক ধরনের কথা শোনা ও বিভিন্ন বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। কেউ বলেন এটি চোখকে স্ক্রিনের আলো থেকে রক্ষা করে, আবার কেউ মনে করেন এটি ছাড়া দীর্ঘ সময় কম্পিউটার ব্যবহার করা উচিত নয়। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। বর্তমানে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা তথ্য অনুযায়ী, কম্পিউটার স্ক্রিনের নীল আলো চোখ নষ্ট করে বা চোখের স্ট্রেইনের প্রধান কারণ এমন বিশেষ কোন প্রমাণ নেই। American Academy of Ophthalmology বিশেষ ব্লু-লাইট চশমাকে নিয়মিত কম্পিউটার ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বলে সুপারিশ করে না।
তাহলে ব্লু লাইট প্রোটেক্ট গ্লাস ব্যবহারের সুবিধা কোথায়? আসুন এই বিষয়টি জানার চেষ্ট করি। কিছু ব্যবহারকারীর কাছে নির্দিষ্ট লেন্স, অ্যান্টি-রিফ্লেকটিভ কোটিং বা কম ঝলকযুক্ত লেন্স আরামদায়ক মনে হতে পারে। বিশেষ করে আপনার যদি প্রেসক্রিপশন চশমার প্রয়োজন থাকে, সঠিক পাওয়ার ও উপযুক্ত লেন্স নির্বাচন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু একটি বিশেষ গ্লাস বা চশমা পরে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার অভ্যাসকে নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অর্থাৎ, ব্লু লাইট প্রোটেক্ট গ্লাস কিনবেন কি না, সেটি ব্যক্তিগত আরাম ও চোখের পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করতে পারে। কিন্তু এটিকে চোখের সমস্যার একমাত্র সমাধান ভাববেন না।
৩। চোখের শুষ্কতা দূর করতে রিফ্রেশিং ড্রপ ব্যবহার
স্ক্রিনে মনোযোগ দেওয়ার সময় চোখের পলক কম পড়ায় চোখের শুষ্কতা বাড়তে পারে। চোখ শুকিয়ে গেলে জ্বালা, খসখসে অনুভূতি, পানি পড়া বা চোখে সাময়িক ঝাপসা দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় লুব্রিকেটিং আই ড্রপ বা Artificial Tears আরাম দিতে পারে। তবে যেকোনো “রিফ্রেশিং ড্রপ” আপনার নিজের ইচ্ছায় বারবার ব্যবহার করা ঠিক নয়। চোখ লাল দেখালেই Redness Remover যুক্ত ড্রপ ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ কিছু ধরনের ড্রপ দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারে শুষ্কতার সমস্যা বাড়াতে পারে। ঘন ঘন ড্রপ দরকার হলে Preservative-free Artificial Tears সম্পর্কে চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা দেখা দিলে ড্রপ ব্যবহার করলেই সব ঠিক হয়ে যাবেএমন ধারণা করবেন না। চোখের পলক ফেলা, কাজের ফাকে বিরতি নেওয়া, বাতাস সরাসরি চোখে না লাগানো এবং স্ক্রিনের অবস্থান ঠিক করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
৪। স্ক্রিনের দূরত্ব ও উচ্চতা ঠিক করুন
একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে করনীয় নিয়ে ভাবার সময় শুধু চোখ নয়, আপনার পুরো কর্মপরিবেশকেও গুরুত্ব দিন। স্ক্রিন চোখের খুব কাছে রাখলে দীর্ঘ সময় কাজ করতে অস্বস্তি বাড়তে পারে। সাধারণভাবে মনিটরকে প্রায় এক হাতের বেশি দূরত্বে, সরাসরি সামনে এবং চোখের সমান বা সামান্য নিচে রাখা আরামদায়ক হতে পারে। বিশেষজ্ঞগণ মনিটরের ওপরের অংশ চোখের সমান বা সামান্য নিচে রাখার পরামর্শ দেয়।
ল্যাপটপ ব্যবহার করলে সমস্যা একটু বেশি হয়, কারণ একই ডিভাইসে স্ক্রিন ও কিবোর্ড যুক্ত থাকে। সম্ভব হলে দীর্ঘ সময়ের ডেস্কওয়ার্কে আলাদা কিবোর্ড ও মাউস ব্যবহার করে ল্যাপটপকে এমন উচ্চতায় রাখুন যাতে ঘাড় বেশি নিচু না করতে হয়। এতে চোখের পাশাপাশি ঘাড় ও কাঁধের ওপরও চাপ কমতে পারে। লেখা ছোট হলে স্ক্রিনের কাছে ঝুঁকে যাবেন না। বরং ফন্ট সাইজ বাড়িয়ে নিন। ব্রাউজারের Zoom, অপারেটিং সিস্টেমের Display Scaling এবং সফটওয়্যারের Text Size ব্যবহার করে পড়া সহজ করুন।
৫। স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা ও ঘরের আলো মিলিয়ে নিন
স্ক্রিনে তাকিয়ে কাজ করে চোখের সমস্যা হলে কাজের জায়গার আলো ও Glare (তীব্র ঝলকানি) কমানোর দিকেও নজর দিন। অন্ধকার ঘরে খুব উজ্জ্বল স্ক্রিন যেমন অস্বস্তিকর, তেমনি খুব উজ্জ্বল ঘরে কম উজ্জ্বল স্ক্রিনও পড়তে সমস্যা তৈরি করতে পারে। লক্ষ্য রাখুন যেন স্ক্রিন ও আশপাশের আলোর মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য না থাকে। জানালা বা বাতির আলো সরাসরি স্ক্রিনে পড়লে Glare (তীব্র ঝলকানি) তৈরি হয়। মনিটরের অবস্থান বদলানো, পর্দা ব্যবহার করা বা ম্যাট স্ক্রিন ফিল্টার নেওয়া উপকারী হতে পারে। আপনি চাইলে দিনের আলো ও রাতের আলোর জন্য আলাদা Brightness Profile রাখতে পারেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট Brightness সবার জন্য সঠিক নয়। যে মাত্রায় লেখা পরিষ্কার দেখা যায় এবং চোখে চাপ কম লাগে, সেটিই আপনার জন্য ভালো ব্যবহারিক সেটিং হতে পারে।
৬। ডার্ক মোড ব্যবহার করা
কম্পিউটারের সফটওয়্যার এর নতুন একঠি থিম হচ্ছে ডার্ক মোড। একটানা কম্পিউটারে কাজ কমানো সম্ভব না হলেও বিরতি বাড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে ডার্ক মোড অনেকের কাছে দেখতে আরামদায়ক, বিশেষ করে কম আলোতে কাজ করার সময়। কালো বা গাঢ় ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা লেখা ব্যবহার করলে স্ক্রিনের সামগ্রিক আলো কম মনে হতে পারে এবং কিছু পরিস্থিতিতে Glare (তীব্র ঝলকানি) এর অনুভূতি কমতে পারে। কিন্তু ডার্ক মোড যে সবার চোখের স্ট্রেইন কমাবে, এমন নিশ্চিত নেই। বরং কিছু ধরনের লেখা গাঢ় ব্যাকগ্রাউন্ডে পড়া কঠিন হতে পারে। EyeWiki-তে Readability সম্পর্কিত আলোচনায় সাধারণ পাঠ্যের ক্ষেত্রে Dark Text on a Light Background অনেক সময় বেশি পাঠযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ডার্ক মোডকে “চোখের ওষুধ” হিসেবে দেখবেন না। আপনি যদি ডার্ক মোডে স্বচ্ছন্দে পড়তে পারেন, বিশেষ করে রাতে, সেটি ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু লেখা ঝাপসা লাগে, চোখ কুঁচকে পড়তে হয় বা বেশি মনোযোগ দিতে হয়—তাহলে Light Mode বা অন্য Contrast সেটিং চেষ্টা করুন।
৭। স্ক্রিন টাইম কমানোর প্র্যাকটিক্যাল উপায়
একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে করনীয় মেনে চলতে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এমন একটি রুটিন তৈরি করা যা আপনি প্রতিদিন বাস্তবে অনুসরণ করতে পারবেন। কাজের প্রয়োজনে কম্পিউটার ব্যবহার করতেই হবে এটা দৃঢ় সত্য, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম কমানো অনেক সহজ, যদি আপনি আগে বুঝতে পারেন কোন সময়টা সত্যিই দরকার। কাজের সময় মোবাইলের অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন। একটি কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বারবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলবেন না। মিটিং শেষ হলে অকারণে একই স্ক্রিনে পড়ে থাকবেন না।
একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা এড়াতে “কম্পিউটার কম ব্যবহার করুন” বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবে কাজের মানুষের জন্য সেটি সবসময় সম্ভব নয়। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত স্মার্ট স্ক্রিন ব্যবহার। কাজকে ছোট ব্লকে ভাগ করুন। দীর্ঘ রিপোর্ট পড়ার মাঝে কাগজে নোট নিন। ফোনে একই কাজ আবার করার বদলে কম্পিউটারেই শেষ করুন। কাজ শেষ হলে বিনোদনের জন্য আরেকটি স্ক্রিনে চলে যাওয়ার আগে আপনার চোখকে কিছুটা সময় স্ক্রিনমুক্ত রাখুন। কম্পিউটারে দীর্ঘখন কাজ করার সময় আপনি একটি সহজ রুটিন বানাতে পারেন: ২০ মিনিট কাজ, ২০ সেকেন্ড দূরে তাকানো; প্রতি ঘণ্টায় উঠে শরীর নড়াচড়া; প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান; এবং দীর্ঘ কাজের মাঝে কয়েক মিনিটের বাস্তব বিরতি। এই রুটিন চোখের পাশাপাশি শরীরকেও স্বস্তি দিতে পারে।
৮। চোখের পলক ফেলার অভ্যাস সচেতনভাবে বাড়ান
আমরা সাধারণত চোখের পলক ফেলার কথা ভাবি না। কিন্তু স্ক্রিনে গভীর মনোযোগ দিলে চোখের পলক কমে যেতে পারে। তাই মাঝে মাঝে নিজেকে মনে করিয়ে দিন “পলক ফেলুন”। কয়েকবার ধীরে ও সম্পূর্ণভাবে পলক ফেলা চোখের অশ্রুস্তর ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। আপনি চাইলে মনিটরের পাশে ছোট একটি নোট লাগাতে পারেন। সেখানে লিখুন “Blink” বা “চোখে পলক ফেলুন।” কাজের চাপের মাঝেও এই ছোট সংকেতটি অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করবে।
৯। এয়ার কন্ডিশনারের বাতাস সরাসরি চোখে লাগতে দেবেন না
একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে করনীয় সম্পর্কে সচেতন হলে ছোট পরিবর্তনও দৈনন্দিন অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বাতাস শুষ্ক হতে পারে। আবার ফ্যান বা AC-এর বাতাস সরাসরি চোখে লাগলে চোখের আর্দ্রতা দ্রুত কমে অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই বসার জায়গা এমনভাবে ঠিক করুন যেন বাতাস সরাসরি মুখে না আসে। প্রয়োজন হলে ঘরের আর্দ্রতা বজায় রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চোখে শুষ্কতা থাকলে ধূমপানের ধোঁয়া, ধুলা ও অতিরিক্ত শুষ্ক পরিবেশ এড়িয়ে চলাও উপকারী।
১০। সঠিক পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করুন
আপনার যদি দূরের বা কাছের জিনিস দেখতে চশমা প্রয়োজন হয়, সেটি না পরে কম্পিউটারে কাজ করা চোখের অস্বস্তি বাড়াতে পারে। ভুল পাওয়ারের চশমাও একই সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা বা ফোকাসের সমস্যা থাকলে চোখ পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে কাছের লেখা দেখতে সমস্যা হলে নিজের মতো করে পুরোনো চশমা ব্যবহার না করে চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আপনার কাজের দূরত্ব অনুযায়ী আলাদা Computer Glasses প্রয়োজন হতে পারে।
১১। কাজের জায়গা পরিষ্কার ও গোছানো রাখুন
একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে করনীয় ঠিক করতে আপনার কাজের সময়, আলো, স্ক্রিনের দূরত্ব এবং বিরতির অভ্যাস একসঙ্গে দেখুন। কম্পিউটার স্ক্রিনে ধুলো বা আঙুলের দাগ থাকলেও লেখা কম পরিষ্কার দেখা যেতে পারে। ফলে আপনি অজান্তেই চোখ কুঁচকে বা সামনে ঝুঁকে কাজ করতে পারেন। নিয়মিত নিরাপদভাবে স্ক্রিন পরিষ্কার রাখুন। কিবোর্ড, মাউস ও ডেস্কও পরিচ্ছন্ন রাখুন। একই সঙ্গে কাজের জায়গায় অপ্রয়োজনীয় আলো, ঝলমলে সাজসজ্জা বা স্ক্রিনের পেছনে খুব উজ্জ্বল আলোর উৎস থাকলে তা কমিয়ে দিন। পরিষ্কার ও সুষম পরিবেশ চোখের আরামের জন্য বেশি উপযোগী।
১২। পানি পান ও ঘুমের দিকে নজর দিন
চোখের স্বাভাবিক আরাম বজায় রাখতে শরীরের সামগ্রিক যত্নও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি পান করুন, নিয়মিত ঘুমান এবং কাজের বাইরে শরীরকে বিশ্রাম দিন। ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় উজ্জ্বল স্ক্রিন ব্যবহার করলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব পড়তে পারে। তাই রাতে ঘুমানোর আগে স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমানো ভালো অভ্যাস। এখানে মনে রাখা জরুরি, শুধু পানি খেলেই সব ধরনের শুষ্ক চোখ ভালো হয়ে যায় না। যদি চোখে দীর্ঘদিন শুষ্কতা বা ব্যথা থাকে, তাহলে এর কারণটি খুঁজে বের করা দরকার।
১৩। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি সহজ দৈনিক চোখের রুটিন
একটানা কম্পিউটারে কাজের মাঝে দূরে তাকানো এবং পলক ফেলা ভুলবেন না। আপনি যদি প্রতিদিন ৬-৮ ঘণ্টা কম্পিউটারে কাজ করেন, তাহলে দিনের শুরুতেই চোখের যত্নের পরিকল্পনা করুন। প্রথমে চেয়ার ও মনিটর ঠিক করুন। তারপর ২০ মিনিটের কাজের ব্লক তৈরি করুন। প্রতিটি ব্লকের শেষে দূরে তাকান। প্রতি ঘণ্টায় উঠে কয়েক মিনিট হাঁটুন। কাজের সময় পলক ফেলার কথা মনে রাখুন। দুপুরে খাবারের সময় পুরোপুরি স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন। খাবার খেতে খেতে ভিডিও দেখা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করার অভ্যাস বাদ দিন। বিকেলে আবার কাজ শুরু করলে ঘরের আলো ও স্ক্রিনের Brightness দেখে নিন। দিনের শেষে কাজ শেষ হলে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন ব্যবহার কমান। এই ছোট রুটিন কঠিন মনে হলেও কয়েকদিন পর স্বাভাবিক হয়ে যায়। লক্ষ্য নিখুঁত হওয়া নয়; বরং প্রতিদিন একটু ভালো অভ্যাস তৈরি করা।
১৪। কোন ভুলগুলো চোখের অস্বস্তি বাড়াতে পারে?
অনেকেই চোখ জ্বালাপোড়া করলে বারবার চোখ ঘষেণ। এতে সাময়িক আরাম লাগলেও চোখের পৃষ্ঠে আরও Irritation হতে পারে। আবার অনেকে স্ক্রিনের লেখা ছোট রেখেই কাজ করেন, কারণ বড় করলে “দেখতে ভালো লাগে না”। এটি অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতে পারে। আরেকটি সাধারণ ভুল হলো বিছানায় শুয়ে অন্ধকার ঘরে ফোন ব্যবহার করা। খুব কম আলোতে উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা অস্বস্তিকর হতে পারে। ঘুমের আগেও দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার না করাই ভালো। সবচেয়ে বড় ভুল হলো উপসর্গকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা। চোখের সমস্যা যদি নিয়মিত হয়, বিশ্রামেও না কমে বা দিন দিন বাড়ে, তাহলে পেশাদার চোখের পরীক্ষা দরকার হতে পারে।
১৫। সময়মত চোখের ডাক্তার দেখানো?
দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে কাজ করে চোখের সমস্যা হলে প্রথমে বিরতি ও পলক ফেলার অভ্যাসটি দেখুন। সাধারণ চোখের ক্লান্তি অনেক সময় বিরতি ও অভ্যাস পরিবর্তনে কমে যায়। কিন্তু আপনার চোখে তীব্র বা স্থায়ী ব্যথা, হঠাৎ দৃষ্টির পরিবর্তন, এক চোখে আকস্মিক দৃষ্টি কমে যাওয়া, আলো সহ্য না হওয়া, নতুন ধরনের অনেক ফ্লোটার বা ঝলক দেখা, অথবা উপসর্গ দ্রুত বাড়তে থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। নিয়মিত চোখের পরীক্ষা করানোও গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যদি আপনার আগে থেকেই চোখের কোনো সমস্যা বা দৃষ্টির পাওয়ার থাকে।
একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা যদি নিজের যত্ন নেওয়ার পরও না কমে, তাহলে শুধু নতুন গ্লাস বা ড্রপ কিনে পরীক্ষা না করিয়ে দীর্ঘদিন চালিয়ে যাবেন না। চোখের পাওয়ার, শুষ্ক চোখ, ফোকাসিং সমস্যা বা অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।
সহজে মনে রাখার মতো ১০টি অভ্যাস
- প্রতি ২০ মিনিটে দূরে তাকান।
- নিয়মিত পলক ফেলুন।
- স্ক্রিন চোখের খুব কাছে রাখবেন না।
- মনিটর চোখের সমান বা সামান্য নিচে রাখুন।
- স্ক্রিনে Glare (তীব্র ঝলকানি) পড়তে দেবেন না।
- লেখা ছোট হলে ফন্ট বড় করুন।
- প্রয়োজন ছাড়া স্ক্রিন টাইম বাড়াবেন না।
- চোখ শুকিয়ে গেলে উপযুক্ত Artificial Tears সম্পর্কে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
- সঠিক পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করুন।
- দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক উপসর্গ হলে চোখ পরীক্ষা করান।
শেষ কথাঃ একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে ১৫টি করনীয় কাজ
একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে করনীয়কে একদিনের কাজ না ভেবে প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসেবে নিন। কম্পিউটার আমাদের কাজের গতি বাড়িয়েছে, কিন্তু চোখের আরামের দায়িত্বও আমাদেরই নিতে হবে। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা স্ক্রিনে কাজ করলেও একটু পরিকল্পনা করলে চোখের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমানো সম্ভব। একটানা কম্পিউটারে কাজ করে চোখের সমস্যা? চোখের যত্নে করনীয় আসলে কোনো জটিল চিকিৎসা-পদ্ধতির নাম নয়, এটি নিয়মিত বিরতি, সঠিক আলো, আরামদায়ক স্ক্রিন সেটিং, পর্যাপ্ত পলক, প্রয়োজনমতো লুব্রিকেটিং ড্রপ এবং সময়মতো চোখ পরীক্ষা করার সমন্বিত অভ্যাস। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চোখে অস্বস্তি হলেই ভয় পাওয়ার দরকার নেই, আবার অবহেলাও করা যাবে না।
আপনার কাজ যদি প্রতিদিন স্ক্রিননির্ভর হয়, আজ থেকেই ২০-২০-২০ নিয়ম শুরু করুন, মনিটরের অবস্থান ঠিক করুন এবং অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম কমান। ব্লু-লাইট গ্লাসকে জাদুকরী সমাধান না ভেবে প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক Eyewear বেছে নিন। ডার্ক মোডকে আরামের একটি অপশন হিসেবে দেখুন, বাধ্যতামূলক চিকিৎসা হিসেবে নয়। আমাদের চোখ প্রতিদিন যে পরিমাণ কাজ করে, তার তুলনায় কয়েক সেকেন্ডের বিরতি খুবই ছোট। কিন্তু সেই ছোট বিরতিই দীর্ঘ দিনের কাজকে আরও আরামদায়ক করে তুলতে পারে। তাই আজ থেকেই নিজের স্ক্রিন-রুটিন একটু বদলান। আপনার চোখ আপনাকে তার আরাম দিয়ে এর মূল্য বুঝিয়ে দেবে।
চিকিৎসা-সংক্রান্ত নোট: এই লেখা সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের জন্য। ব্যক্তিভেদে চোখের সমস্যা ও চিকিৎসা আলাদা হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী, তীব্র বা হঠাৎ দৃষ্টির পরিবর্তন হলে চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

অলইনফোনেষ্ট এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url