চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার ৬টি ঘরোয়া উপায়

 চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার ৬টি ঘরোয়া উপায়



চোখের নিচের কালো দাগ মানে, মুখের স্বাভাবিক সৌন্দর্যটাই অনেকটা ম্লান করে দেয়। আপনি যখন আয়নায় তাকিয়ে চোখের নিচে কালো দাগ দেখতে পান, তখন মনের মধ্যে একটা কথাই বারবার আসে চোখের নিচের এই কালো দাগ কি ভাবে কমানো যায়।


চোখের কালো দাগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আপনি যদি দামী দামী প্রশাধনী ব্যবহার করতে না চান, তবে কোন সমস্যা নেই, আপনার ঘরে থাকা কিছু পরিচিত উপাদান এবং কিছু ভালো অভ্যাস গড়ে তুললেই আপনি আপনার চোখের নিচের কালো দাগ সহজে দূর করতে পারবেন। এই পোষ্ট এর মাধ্যমে আপনি আপনার ঘরের কোন কোন উপাদান, কিভাবে ব্যবহার করবেন এবং কোন কোন ভালা অভ্যাস গড়ে তুলবেন এসব জানতে পারবেন।

পোষ্ট সূচিপত্রঃ চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার ৬টি ঘরোয়া উপায়

চোখের নিচে কালো দাগ কি এবং কেন হয়?

আমাদের মুখমন্ডল এর স্বাভাবিক রং সবখানে একই রকম থাকে। কিন্তু কিছু সময় পর চোখের নিচের অংশের স্বাভাবিক রং মুখ মন্ডল এর রং এর মত থাকেনা। তখন চোখের নিচে যে অস্বাভাবিক রং দেখা দেয় তাকে কালো দাগ বলে। আমাদের চোখের নিচের ত্বকে, যখন কালো দাগ হয়ে যায় তখন তাকে ডার্ক সার্কেল ও বলা হয়। আপনার স্বাভাবিক ত্বকের রং এর উপর নির্ভর করে চোখের নিচের ত্বক বা স্থানটি বেগুনি, নীল, বাদামী বা কালো রংয়ের বিভিন্ন শেড দেখা যায়। আমাদের চোখের নিচের অংশ অত্যন্ত পাতলা ও ভঙ্গুর প্রকৃতির হয় এবং একে স্বাভাবিক ভাবে ধরে রাখার মত চর্বি খুব সামান্য পরিমানে থাকে। এই কারণে রক্তনালি, পেশি এবং হাড়ের মতো অভ্যন্তরীণ গঠনগুলো আরো স্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। চোখের নিচের স্থানটি যখন তার চারপাশের ত্বকের চেয়ে বেশি কালো হয়ে যায়, তখন ডার্ক সার্কেল দেখা দেয়। এই ডার্ক সার্কেল একটি বা দুটি চোখেই হতে পারে।

সাধারণত চোখের চারপাশে কালো দাগ পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রয়োজনে তুলনায় কম ঘুম। বিশেষজ্ঞের মতে চোখের নিচের এই কালো দাগ এড়াতে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যেক রাতে অন্তত সাত থেকে আট ঘন্টা ঘুমানো প্রয়োজন। ৭-৮ ঘন্টা কম ঘুমালে চোখের নিচে যে নার্ভ আছে সেখানে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। অনেকেই মনে করে শুধু ক্লান্ত বোধ করার কারণে আমাদের চোখের চারপাশে কালো দাগ পড়ে। শুধু এই একটি কারন নয় এর সাথে আরো কিছু বিষয় আছে। যেমন আপনার বয়স, চোখের উপর চাপ, এলার্জি এবং জিনগত সমস্যা এ সবগুলো চোখের চারপাশে কালো দাগ নিয়ে আসার কারন হতে পারে। আপনার চোখের নিচে কালো দাগ বা ডার্ক সার্কেল আপনার মুখে ক্লান্ত ও মলিন ভাব ফুটিয়ে তোলে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত মানুষক চাপ, পানিশূন্যতা, অ্যালার্জি, বেশি বেশি রোদে থাকা অথবা বংশগত বা জিনগত কারনেও এটি দেখাদিতে পারে।

আপনি যদি নিয়মিত ও নিরাপদ ঘরোয়া উপাদান ব্যবহার করে চোখের চারপাশের ত্বককে সতেজ রাখতে পারেন। তাহলে আপনার চোখের নিচে কালো দাগ দূর হয়ে যাবে। আসুন জেনে নেই আপনার ঘরের কোন কোন জিনিস গুলো ব্যবহার করলে চোখের নিচের ডার্ক সার্কেল বা কালো দাগ দূর করা যাবে।

শসা ব্যবহার

চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার ঘরোয়া উপায় হিসেবে শসার ব্যবহার বেশ পরিচিত। আমরা জানি শসায় প্রচুর পরিমানে পানি থাকে। আপনি যদি শসা দিয়ে চোখের কালো দাগ দূর করতে চান তাহলে প্রথমে একটি শাসা ধুয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করুন, তারপর পাতলা করে কেটে কিছুক্ষণ ফ্রিজে রাখবেন। শসা ব্যবহারের পূর্বে আপনার চোখের চারপাশ ভালো করে ধুয়েনিন এবং চোখ বন্ধ করে ঠান্ডা করা শসাগুলো চোখের উপরে বা নিচের অংশের প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট রাখুন। কিছু সময় পর পরিষ্কার পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে নিন। একটা বিষয় খেয়াল করবেন, শসা ব্যবহারের পর আপনি একটা ফ্রেশ ফ্রেশ ভাব উপভোগ করবেন। শসা চোখের কালো দাগ দূর করার পাশপাশি চোখের সাময়িক ফোলা এবং ক্লান্তভাব কমাতে খুবই উপকারি। চোখের নিচে শসা ব্যবহার কারণে যদি আপনার চোখ জ্বালা করতে থাকে, তাহলে সাথে সাথে মুখ ধুয়ে ফেলবেন এবং মনে রাখবেন যে, শসা তে আপনার অ্যালার্জি আছে। তাই এটি ব্যবহার থেকে সাবধান থাকুন।

আলুর রস

আলু আমাদের খাদ্য তালিকায় ৩য় স্থানে জায়গা করে নিয়েছে। আপনার আমার বাসায় প্রায় সবসময় আলু থাকেই। আর এই আলুর রস দিয়ে চোখের নিচে কালো দাগ দূর করাও যায়। আলুর রস বের করারর জন্য, প্রথেমে একটি আলু নিন এবং ভালো করে ধুয়ে নিন যাতে কোন ময়লা না থাকে। এর পর আলুটিকে ভালোভাবে কুরিয়ে অথবা ব্লেন্ড করে রস বের করে নিবেন। পরিষ্কার তুলায় অল্প পরিমাণ রস নিয়ে আপনার চোখের নিচে আলতোভাবে লাগিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে দিন। এরপর পরিষ্কার ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। খেয়াল রাখবেন আলুর রস যেন আপনার চোখের ভিতরে না যায়। চোখের ভেতর আলুর রস গেলে চোখে জ্বালা হতে পারে। আপনার ত্বক যদি সংবিধানশীল হয় তাহলে, আলুর রস চোখের নিচে লাগানোর আগে সেটা আপনার হাতের যেকোন অংশে লাগিয়ে পরীক্ষা করে নেয়াই ভালো। যদি হাতের মধ্যে আলুর রস কোন রিএকশন না করে তাহলে চোখে লাগালে সমস্যা হবে না, আর যদি হাতে কোন রকম জ্বালা অথবা চুলকানি হয় তাহলে চোখের নিচে লাগানো প্রেয়োজন নেই। তাহলে বুঝবেন আপনার ত্বক খুবই সংবেনশীল।

ঠান্ড পানির  কমপ্রেস

আপনার চোখের নিচে ক্লান্তি বা সাময়িক ফোলা থাকলে ঠান্ডা পানির কমপ্রেস খুব সহজে আপনাকে স্বস্থি এনে দেবে। ঠান্ডা পানির কম্প্রেস দেয়ার জন্য আপনি একটি পরিস্কার নরম কাপড় ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে নিন এবং পানি ভালোভাবে চিপে বের করুন। চোখ বন্ধ করে কাপড়টি চোখের উপর কয়েক মিনিট আলতো ভাবে রাখুন। আপনার ইচ্ছে মত কাপড়টি আবার ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে পানি চেপে আবার চোখে লাগাতে পারে। ঠান্ডা অনুভূতি চোখের চারপাশে অস্বস্তি ও ফোলা ভাব সাময়িকভাবে কমাতে সাহায্য করতে পারে বিশেষ করে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ল্যাপটপ দেখার পর এই ঠান্ডা কমপ্রেস আপনার চোখে খুবই আরামদায়ক অনুভুতি দিবে। আপনি কোন অবস্থাতেই ঠান্ডা বরফ সরাসরি চোখের নিচে বসবেন না। কারণ এতে ত্বকের ক্ষতি বা জ্বালা হতে পারে। আপনি যদি এই অভ্যাস টি যতি নিয়মিত করেন তাহলে আপনার চোখের নিচে কালো দাগ হবে না এবং চোখ থাকবে খুবই সতেজ ও সুন্দর।

টি ব্যাগ এর ব্যবহার

টি ব্যাগ চোখের নিচের কালো দাগ দূর করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আমাদের মধ্যে অনেকে আছে যারা শরীরের মেদ কমানোর জন্য গ্রিন টি নিয়মিত খান। আপনি যদি গ্রিন টি খেয়ে থাকেন, তাহলে গ্রীন টির ব্যাগটি ফেলে না দিয়ে, এই ব্যাগ দিয়ে আপনার চোখের নিচের কালো দাগ দূর করতে পারেন। গ্রীন টি না থাকলে যেকোন টি ব্যাগ হলেও চলবে। এর জন্য আপনাকে প্রথমে ব্যবহৃত টি ব্যাগটি ভালোভাবে ধুয়ে ঠান্ডা করে নিতে হবে। এরপর আপনার চোখ ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। এখন ঠান্ডা করা টি ব্যাগ প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট আপনার চোখের উপর রাখুন। ঠান্ডা টিব্যাগের রস আপনার চোখের নিচে কালো দাগ দূর করতে অনেকটাই সহায়ক ভুমিকা পালন করবে। তবে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে কি ব্যাগে যেন অতিরিক্ত পানি বা চা না থাকে।

পর্যাপ্ত ঘুম

চোখের নিচে কালো দাগ কমোতে পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অভ্যাস। আপনি যদি প্রতিদিন রাত জেগে থাকেন, অনিমিত ঘুম বা দীর্ঘ সময়  বিশ্রাম না নিয়ে থাকেন। তাহলে আপনার চোখের নিচে কালো দাগ চলে আসবেই। তাই আপনাকে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে এবং ঘুমানোর আগে কোনভাবে অতিরিক্ত মোবাইলে ভিডিও, সোসাল মিডিয়া ঘাটাঘাটি করবেন না। আপনার ঘুম নিশ্চিত করার জন্য ঘুমের এক ঘণ্টা আগে চা অথবা কফি খাবেন না। ঘুমের কোন ব্যাঘাত না ঘটে এজন্য আপনার ঘরটি যেন অবশ্যই নীরব এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। তাহলে আপনার ঘুম ভালো হবে।

আপনার ঘুম এর সাথে আপনার শরীরের অনেক কিছুর ভালোথাকা নির্ভর করে। পর্যাপ্ত ঘুম হলে শরীরে প্রয়োজনীয় হরমন নিঃসরণ হয়। এত আপনার শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বজায় থাকে। শরীরে প্রয়োজনী হরমন নিঃসরণ হয় না হলে, আপনি সারাক্ষণ অস্বস্থি তে ভুগবেন। আপনার অযথাই ক্লান্ত ভাব থাকবে, সারাদিন ঘুম ভাব থাকবে, খিদে কমে যাবে। এই অভ্যাস টি নিয়মিত হতে থাকলে আপনার শরীর আপনার কথা শুনবে না। তখন দেখবেন যে আপনার চোখের নিচে কালো দাগ আসবে এবং এর সাখে আপনার মুখেও ডার্কস্পট পড়া শুরু করবে। আপনার চোখ যেন গর্তে ঢুকে যাচ্ছে। তাই এই সব সমস্যা থেকে সহজেই পরিত্রাণ পেতে আপনাকে অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমানে ঘুমাতে হবে।

পরিমাণ মত পানি পার করা 

শরীরের পানির ঘাটতি হলে ত্বক শুষ্ক ও ক্লান্ত দেখায়। তাই আপনি যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি না খেয়ে থাকেন তাহলে আপনার চোখের নিচে কালো দাগ আসবেই, এমনকি আপনার চোখের নিচে গর্তের মত দেখা যেতে পারে। আপনার শরীরের চাহিদা অনুযায়ী আপনাকে পানি পান করতে হবে। সবাই কে একই পরিমাণ পানি পান করতে হয় না। আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম, খাবার এবং আপনার স্বাস্থের উপর নির্ভর করে পানির চাহিদা পূরণ করতে হয়। আপনার যখন তৃষ্ণা পাবে তখন আপনাকে অবশ্যই পানি পান করতে হবে।

আমাদের শরীরের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ পানি। বিভিন্ন কাজের জন্য শারীরিক পরিশ্রমের কারনে অথবা অতিরিক্ত গরম এর কারনে যখন আমাদের শরীরের ঘাম হয়, তখন শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দেয়। পানির এই ঘাটতি সঠিক ভাবে পুরণ না করলে শরীরে পানিশূণ্যতা দেখা দেয়। আর এই পানিশূণ্যতা বিভিন্ন রোগ এর আগমন ঘটায়।  পানি শরীরের সঠিক সময় না পৌঁছালে আপনার ত্বকে বিভিন্ন প্রকারের সমস্যা দেখা দেয় তাই। শরীরকে হাইড্রেড করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি এবং পানি সমৃদ্ধ ফলমূল খাওয়া জরুরি। ডাক্তার এর পারার্মশ অনুযায়ী আমাদের সব সময় বেশি পরিমানে পানি পান করতে হবে এবং প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার সময় অবশ্যই সাথে পানি রাখতে হবে। তাই আপনার শরীরে পানির সঠিক উপস্থিতি আপনার চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার সঠিক উপায়।

শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য

আপনার চোখের নিচে কালো দাগ নিয়ে দুশ্চিন্তা করার আগে মনে রাখা দরকার, এই কালো দাগ এর কারণ সবার ক্ষেত্রে এক নাও হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে রাত জাগা ও ক্লান্তি হতে পারে, আবার অনেকের ক্ষেত্রে বংশগত বৈশিষ্ট্য, এলার্জি ইত্যাদি কারন হতে পারে। তাই চোখের নিচের কালো দাগ দূর করার ঘরোয়া উপায় ব্যবহার করার সময় আপনাকে অবশ্যই বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখতে হবে। শসা, আলুর রস, ঠান্ডা পানির কমপ্রেস বা টি ব্যাগ চোখের চারপাশের সামরিক সতেজতা দেয়। কিন্তু এগুলো সবার  চোখের নিচে কালো দাগ স্থায়ীভাবে দূর করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনার ত্বকের প্রতি আপনার নিয়মিত যত্ন। আপনি যদি প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমান, পর্যাপ্ত পানি পান করেন, পুষ্টিকর খাবার খান এবং চোখের নিচের ত্বকের নিয়মিত যত্ন করেন. তাহলে আপনার চোখের নিচের কালো দাগ আসবে না। কোন উপাদান ব্যবহারে জ্বালা, লালভাব বা অস্বস্তি হলে সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আপনার চোখের নিচে কাল দাগ দীর্ঘদিন ধরে  থাকলে অথবা হঠাৎ করে বেড়ে গেলে, নিজে নিজে কোন উপাদান ব্যবহার করার আগে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো। মনে রাখবেন আপনার সুন্দর চোখের জন্য শুধু কালো দাগ ঢেকে রাখলেই হবে না, আপনার সুন্দর চোখ ও ত্বকের সুস্থতার দিকেও নজর দেয়াই আসল যত্ন।







এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অলইনফোনেষ্ট এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url