এক নজরে বাংলাদেশের সংবিধান (দ্বিতীয় পর্ব)

সংবিধানের ১১টি ভাগ, ১৫৩টি অনুচ্ছেদ, রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি, মৌলিক অধিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ

প্রথম পর্বে আমরা সংবিধানের ইতিহাস, প্রয়োজনীয়তা এবং প্রণয়নের পটভূমি সম্পর্কে জেনেছি। এবার জানব সংবিধানের মূল কাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ এবং নাগরিক হিসেবে আমাদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে।


বাংলাদেশের সংবিধানের কাঠামো

বাংলাদেশের সংবিধান একটি সুসংগঠিত লিখিত দলিল। এতে বর্তমানে—


  • ১১টি ভাগ (Part)

  • ১৫৩টি অনুচ্ছেদ (Article)

  • ৭টি তফসিল (Schedule)

রয়েছে।

প্রতিটি ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দিষ্ট বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।


সংবিধানের ১১টি ভাগ সহজ ভাষায়

প্রথম ভাগ : প্রজাতন্ত্র (অনুচ্ছেদ ১–৭ক)

এখানে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।

এ অংশে আলোচনা করা হয়েছে—

  • বাংলাদেশের নাম

  • রাষ্ট্রের সীমানা

  • জাতীয় সংগীত

  • জাতীয় পতাকা

  • রাজধানী

  • রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে সংবিধানের মর্যাদা

  • জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস

সহজভাবে বললে, এই অংশটি বাংলাদেশের পরিচয়পত্রের মতো।


দ্বিতীয় ভাগ : রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি

এই অংশে রাষ্ট্র কোন আদর্শ অনুসরণ করবে তা বলা হয়েছে।

এখানেই রয়েছে বাংলাদেশের বিখ্যাত চারটি মূলনীতি


তৃতীয় ভাগ : মৌলিক অধিকার

বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের যেসব অধিকার রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে, সেগুলো এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই অংশকে অনেকেই সংবিধানের "হৃদয়" বলে থাকেন।


চতুর্থ ভাগ : নির্বাহী বিভাগ

এখানে আলোচনা করা হয়েছে—

  • রাষ্ট্রপতি

  • প্রধানমন্ত্রী

  • মন্ত্রিপরিষদ

  • নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা ও দায়িত্ব


পঞ্চম ভাগ : আইনসভা

এ অংশে জাতীয় সংসদের গঠন, সদস্য নির্বাচন, অধিবেশন এবং আইন প্রণয়নের নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছে।


ষষ্ঠ ভাগ : বিচার বিভাগ

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপিল বিভাগের ক্ষমতা ও দায়িত্ব এখানে উল্লেখ রয়েছে।


সপ্তম ভাগ : নির্বাচন

নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ভিত্তি এই অংশে নির্ধারণ করা হয়েছে।


অষ্টম ভাগ : মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক

সরকারি অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তা নিরীক্ষার জন্য যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার বিধান এখানে রয়েছে।


নবম ভাগ : সরকারি কর্ম কমিশন (PSC)

সরকারি চাকরিতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এখানে বলা হয়েছে।


দশম ভাগ : সংবিধান সংশোধন

কোন প্রক্রিয়ায় সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করা যাবে, তা এই অংশে উল্লেখ রয়েছে।


একাদশ ভাগ : বিবিধ

সংবিধানের বিভিন্ন অতিরিক্ত ও প্রশাসনিক বিষয় এই অংশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি

বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি।

এই চারটি নীতিই স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শিক ভিত্তি।


১. জাতীয়তাবাদ

জাতীয়তাবাদ বলতে বোঝায় দেশের মানুষ নিজেদের জাতীয় পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতাকে সম্মান করবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালি সংস্কৃতি জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


২. সমাজতন্ত্র

এখানে সমাজতন্ত্র বলতে সকল মানুষের জন্য ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাকে বোঝানো হয়েছে।

অর্থাৎ—

  • দারিদ্র্য কমানো

  • সামাজিক বৈষম্য হ্রাস

  • সবার জন্য শিক্ষা

  • সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা

ইত্যাদি নিশ্চিত করার চেষ্টা।


৩. গণতন্ত্র

গণতন্ত্র মানে জনগণই রাষ্ট্রের মালিক।

জনগণ ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করবে এবং সেই প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।


৪. ধর্মনিরপেক্ষতা

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের সঙ্গে ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করবে না।

প্রত্যেক নাগরিক নিজের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন।


মৌলিক অধিকার কী?

মৌলিক অধিকার হলো এমন কিছু অধিকার, যা প্রত্যেক নাগরিক জন্মগতভাবে পাওয়ার যোগ্য এবং রাষ্ট্র যেগুলো রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করে।

সহজভাবে বললে—

নাগরিক হিসেবে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে অধিকারগুলো অপরিহার্য, সেগুলোই মৌলিক অধিকার।


বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার

১. আইনের দৃষ্টিতে সমতা

সব নাগরিক আইনের চোখে সমান।

ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ কিংবা ধর্মের ভিত্তিতে আইন ভিন্ন হবে না।


২. বৈষম্য নিষিদ্ধ

জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে কাউকে বৈষম্যের শিকার করা যাবে না।


৩. সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ

যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যেক নাগরিক সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবেন।


৪. জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার

আইন ছাড়া কাউকে তার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।


৫. আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার

কোনো ব্যক্তি অন্যায়ের শিকার হলে আদালতের সাহায্য চাইতে পারবেন।


৬. ন্যায়বিচারের অধিকার

প্রত্যেক ব্যক্তি সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন।


৭. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

প্রত্যেক নাগরিক নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন, তবে তা আইন ও অন্যের অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।


৮. ধর্মীয় স্বাধীনতা

প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের ধর্ম পালন, প্রচার এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন।


৯. চলাচলের স্বাধীনতা

আইন অনুযায়ী দেশের যেকোনো স্থানে বসবাস বা চলাচল করার অধিকার রয়েছে।


১০. পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা

যোগ্যতা অনুযায়ী যেকোনো বৈধ পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে।


গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদগুলো সহজে মনে রাখুন

অনুচ্ছেদ ৭

সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস।

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদগুলোর একটি।


অনুচ্ছেদ ৮

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে।


অনুচ্ছেদ ২৬

সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন কার্যকর হবে না।


অনুচ্ছেদ ২৭

সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান।


অনুচ্ছেদ ২৮

ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য করা যাবে না।


অনুচ্ছেদ ৩২

জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।


অনুচ্ছেদ ৩৭

শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ করার অধিকার রয়েছে।


অনুচ্ছেদ ৩৯

চিন্তা, বিবেক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।


অনুচ্ছেদ ৪১

ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।


অনুচ্ছেদ ৬৫

জাতীয় সংসদের গঠন সম্পর্কে বলা হয়েছে।


অনুচ্ছেদ ৯৪

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার বিধান রয়েছে।


অনুচ্ছেদ ১৪২

সংবিধান সংশোধনের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।


পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

মনে রাখার মতো তথ্য

  • সংবিধানের মোট ভাগ — ১১টি

  • মোট অনুচ্ছেদ — ১৫৩টি

  • মোট তফসিল — ৭টি

  • গৃহীত — ৪ নভেম্বর ১৯৭২

  • কার্যকর — ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২


বাস্তব জীবনে এই বিষয়গুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অনেকেই মনে করেন সংবিধান শুধু পরীক্ষার বিষয়। বাস্তবে তা নয়।

আপনি যখন—

  • ভোট দেন,

  • চাকরির আবেদন করেন,

  • আদালতে ন্যায়বিচার চান,

  • সংবাদ পড়েন,

  • নিজের মত প্রকাশ করেন,

  • ধর্ম পালন করেন,

তখন সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ আপনার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়।

অর্থাৎ, সংবিধান শুধু একটি বই নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের ভিত্তি।


দ্বিতীয় পর্বের উপসংহার

বাংলাদেশের সংবিধানের ১১টি ভাগ রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়কে সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করেছে, আর মৌলিক অধিকার প্রতিটি নাগরিককে মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জীবনযাপনের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেয়।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

All Info Nest- এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url