খেলা নয়, এ যেন এক বিশ্বজনীন উৎসব: ফিরে দেখা বিশ্বকাপ ফুটবলের রোমাঞ্চকর ইতিহাস
বিশেষ প্রতিবেদন:
চারটে বছর ধরে অপেক্ষা। তারপর একটা মাস ধরে পুরো পৃথিবীর ঘুম হারাম। একদিকে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার চিরন্তন দ্বৈরথ, অন্যদিকে জার্মানি, ইতালি বা ফ্রান্সের নিখুঁত ফুটবল কৌশল। সাথে থাকে মরক্কো বা ক্রোয়েশিয়ার মতো কোনো জায়ান্ট কিলার’দের রূপকথার গল্প।
হ্যাঁ, কথা হচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ নিয়ে। ফুটবল স্রেফ ২২ জন খেলোয়াড়ের একটি খেলা হতে পারে, কিন্তু বিশ্বকাপ? সে তো কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন, আবেগ আর উন্মাদনার আরেক নাম।
১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মন্টভিডিওতে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, আজ তা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মহাযজ্ঞ। চলুন, টাইম মেশিনে চড়ে ঘুরে আসা যাক বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস থেকে।
শুরুর গল্প: যখন মাত্র ১৩টি দল নিয়ে ফুটবল বিশ্বকে জাগিয়ে তোলা হলো
ফিফার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুল রিমে যখন একটি বৈশ্বিক ফুটবল টুর্নামেন্টের স্বপ্ন দেখছিলেন, অনেকে তখন হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে যখন প্রথম বিশ্বকাপ মাঠে গড়াল, তখন ইতিহাস তৈরি হয়ে গেল।
সে যুগে বিমান যাত্রা আজকের মতো সহজ ছিল না। ইউরোপের দলগুলোকে জাহাজে চড়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে দুই সপ্তাহ জার্নি করে আসতে হয়েছিল উরুগুয়েতে! মাত্র ১৩টি দেশ নিয়ে আয়োজিত সেই প্রথম আসরের ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে স্বাগতিক উরুগুয়ে।
যুদ্ধ, বিরতি এবং “মারাকানা ট্র্যাজেডি“
১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপের পর মানব ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ”-এর কারণে দীর্ঘ ১২ বছর বিশ্বকাপ বন্ধ ছিল। ১৯৫০ সালে যখন ব্রাজিলে আবার বিশ্বকাপ ফিরল, তখন বিশ্ব দেখল এক ট্র্যাজেডি।
জেতার জন্য ব্রাজিলের শুধু একটা ড্র দরকার ছিল। প্রায় দুই লাখ দর্শক ধারণক্ষম মারাকানা স্টেডিয়ামে উৎসবের সব প্রস্তুতি শেষ। কিন্তু উরুগুয়ে ২-১ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে স্তব্ধ করে দিল পুরো দেশকে। ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচটি আজো ‘মারাকানাজো’ বা মারাকানা বিপর্যয় নামে পরিচিত।
পেলের আগমন এবং সাম্বা ফুটবলের সোনালী যুগ
১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বকে দিল তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উপহার—১৭ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর, নাম তাঁর পেলে। তাঁর জাদুকরী পায়ের ছোঁয়ায় ব্রাজিল জিতল তাদের প্রথম বিশ্বকাপ।
এরপর ১৯৬২ এবং ১৯৭০—পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিল ফুটবলকে এক শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়, যাকে বলা হতো ‘সাম্বা ফুটবল’। পেলের তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের সেই অনন্য রেকর্ড আজো কেউ ভাঙতে পারেনি।
বিশ্বকাপের
সফলতম দলগুলো (শিরোপা জয়ের সংখ্যা)১.ব্রাজিল-🏆🏆🏆🏆🏆(৫বার)
২. জার্মানি - 🏆🏆🏆🏆 (৪ বার)৩.ইতালি-🏆🏆🏆🏆(৪বার)৪.আর্জেন্টিনা-🏆🏆🏆(৩বার)
১৯৮৬: ম্যারাডোনা এবং একটি ‘একক’ বিশ্বকাপ
বিশ্বকাপের ইতিহাসে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কোনো একজন খেলোয়াড় কি একা একটা দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে পারেন? উত্তর হবে—হ্যাঁ, পেরেছিলেন। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা যা করেছিলেন, তা রূপকথাকেও হার মানায়।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর করা বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের ঠিক ৪ মিনিট পরেই তিনি করেছিলেন ইতিহাসের সেরা গোলটি। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একাই ইংল্যান্ডের ৫ জন ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে যে গোলটি তিনি করেছিলেন, তা আজো ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃত।
আধুনিক যুগ ও প্রযুক্তির ছোঁয়া
একবিংশ শতাব্দীতে এসে ফুটবল আর শুধু মাঠের খেলা রইল না, এটি হয়ে উঠল প্রযুক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী। ২০০২ সালে প্রথমবার এশিয়ায় (জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া) যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করা হয়। এরপর ২০১০ সালে আফ্রিকার মাটিতে এবং ২০২২ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে প্রথমবারের মতো শীতকালে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়।
কাতারের সেই ফাইনালকে বলা হয় ইতিহাসের সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের হ্যাটট্রিক বনাম লিওনেল মেসির জোড়া গোল—টাইব্রেকারে নাটকীয় জয়ের পর মেসির হাতে বিশ্বকাপ ওঠার দৃশ্যটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফ্রেম হয়ে থাকবে।
জানেন কি? বিশ্বকাপের কিছু রোমাঞ্চকর তথ্য:
- সবচেয়ে বেশি গোল: জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা (১৬টি গোল)।
- এক আসরে সর্বোচ্চ গোল: ১৯৫৮ সালে ফ্রান্সের জা ফন্টেইন একাই করেছিলেন ১৩টি গোল!
- সবচেয়ে দ্রুততম গোল: ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তুরস্কের হাকান শুকুর খেলা শুরুর মাত্র ১১ সেকেন্ডে গোল করেছিলেন।
শেষ বাঁশি
১৯৩০ সালের সেই ১৩টি দলের আসর আজ সময়ের বিবর্তনে ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে ৪৮টি দলের এক বিশাল মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে। খেলার নিয়ম বদলেছে, অফসাইড চেনার জন্য এসেছে ভিএআর (VAR) প্রযুক্তি, বদলে গেছে বলের ডিজাইন। কিন্তু বদলায়নি একটা জিনিস—বিশ্বকাপের সেই চিরন্তন উন্মাদনা।
আজো যখন বিশ্বকাপের থিম সং বেজে ওঠে, তখন পৃথিবীর সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষ এক হয়ে যায় ফুটবলের সবুজ গালিচায়। আর এটাই হলো ফুটবল বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্য।
ধন্যবাদ।


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url